আজ ৩০শে শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৪ই আগস্ট ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

গ্রন্থাগারের আভিজাত্য ও সংজ্ঞায়ন

নিজস্ব ডেস্কঃ

চেতনার কেন্দ্র বিন্দুতে যে স্ফুলিঙ্গ বাণী বদ্ধ ভাব ধারায় উন্মুখ হতে চায় তারই আলোকে সামান্য বর্ণনায় মানুষ খুঁজে পায় তার আপন ঐতিহ্য; জাগে আশা দেখে স্বপ্ন; স্বপ্নের সেই হলাহল কণ্ঠে ধারণ করে নয় বরং বাস্তবতা কে উপলব্ধি করে আরহণ করতে চায় তার সফলতা ও স্বার্থকতার স্বর্ণ শিখরে। আর এই সফলতার ও স্বার্থকতার গোপন সূত্র হচ্ছে জ্ঞানের রাজ্যে অবাধ বিচরণ। আর এই অবাধ বিচরনের জাগতীয় মূখ্যম লীলাভূমি হচ্ছে গ্রন্থাগার।

রুটি-মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে কিন্তু একখানা বই অনন্ত যৌবনা যদি তেমন বই হয়। বইয়ের গুরুত্ব কতখানি তা এই অমর বাক্যটিতে ভীষণভাবে চিত্রিত হয়েছে। মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে একটা সময় লাইব্রেরি ছিল বড় আভিজাত্য ও সামাজিক মর্যাদার প্যারামিটার। অর্থ্যাৎ যে বাড়িতে লাইব্রেরি থাকতো সে বাড়ির মর্যাদা থাকতো সবার উর্ধ্বে।

প্রাচীন কালের শাসনতন্ত্রীয় রাজ দরবার গুলোর মধ্যে ছিল সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। রাজ দরবার গুলো সে কালের যুগ শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী-গুণী মানুষের আনাগুনা ছিল নিয়মিত। রাজা বাদশারার জ্ঞানীদের অত্যধিক কদর করত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় দিল্লীর রাজ দরবারের লাইব্রেরি, নেপালের রাজ দরবারের লাইব্রেরি ও লাইব্রেরি নগরীখ্যাত বাগদাদ নগরী।

সভ্যতা ও সময়ের বিবর্তনে তা আজ নতুন প্রজন্মের নিকট গল্পের খোরাকে পরিণত হয়েছে। ৮০ দশকে মানুষ বই পড়ত, তখন পাড়ায় পাড়ায় গ্রন্থাগার ছিল। পরিপূর্ণ ছিল গ্রন্থাগার কেন্দ্রিক সাহিত্য আসর গুলো। বিট্রিশ বিরুধী আন্দোলনের সময় স্বদেশীয় লোকজন গায়ে-গতরে শক্তি বৃদ্ধির জন্য যেমন গড়ে তুলতো ব্যায়ামাগার; ঠিক তেমনি মস্তিষ্ক এর শক্তি বাড়ানোর জন্য লোকজন সংঘবদ্ধভাবে গড়ে তুলতো গ্রাম মহল্লায় গণগ্রন্থাগার।

আর বর্তমান সময়ে মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ভোগ-বিলাসে। বিশেষ করে বাঙ্গালি জাতিকে শতবর্ষ পূর্বে রবি ঠাকুর বলে গিয়েছেন “বাঙ্গালি খুব আরাম প্রিয় জাতি, সংগ্রামি পথ বেছে নিতে তারা নারাজ”। একটি জাতির সৃজনশীলতা, নান্দনিকতা, জ্ঞান, বিজ্ঞান, মেধা, মনন ও বুদ্ধিবৃত্তি বিকাশের সূতিকাগার হল পাঠাগার। গ্রন্থাগারের বৃহৎ জ্ঞানের রাজ্যে বিচরণ করে মুক্তবুদ্ধি চর্চার দ্বারা ব্যক্তিক, গোষ্ঠিক, জাতিক ও দৈশিক উন্নয়ন এবং অগ্রগতির বৈশ্বিক মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়।

গ্রাম প্রধান দেশ হিসেবে গ্রামীন জনপদে উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। লাখো বীরের রক্তস্নাত সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিদ্যা-বুদ্ধি, চিন্তনে চেতনে মেধায় মননে মার্শাল ম্যাকলুহানের বিশ্বায়নের বিশ^পল্লীতে নিজেদের যোগ্যতার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে জ্ঞানের রাজ্যে অবাধ বিচরণ অপরিহার্য। সুষম সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক সৃজনশীল সমাজ বিনির্মাণে পাঠাগার রাখে অনন্য ভূমিকা।

গ্রন্থাগার কী? এবার আসি সে প্রসঙ্গে গ্রন্থাগার হলো গ্রন্থের সুবিন্যস্ত কাঠামোগত গ্রন্থের সমাহার। যেখানে জ্ঞান বিজ্ঞানের অজস্র শাখা-প্রশাখার সমন্বয় সাধিত হয় বিশেষ নিয়মের মধ্য দিয়ে।গ্রন্থাগার বা লাইব্রেরি শব্দটির আদি শব্দ হচ্ছে Liber, এটি একটি ল্যাটিন শব্দ এর অর্থ হলো বই। শব্দটির আরেকটি প্রতিশব্দ হচ্ছে Libraium, যার অর্থ হচ্ছে বই সংরক্ষণের স্থান। Anglo French ভাষায় Librarie শব্দের অর্থ Collection of Books বা বইয়ের সমাহার।

তাই বলা যায়, গ্রন্থাগার একটি জীবন্ত উপকরণ, যা অতীতের সমস্ত তথ্য সংরক্ষণ করে রাখে বর্তমান প্রজন্মের ব্যবহার করার জন্য । ইহা এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা অতীত এবং বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে এবং তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে যা তথ্য সমূহের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ব্যবহার উপযোগী করে তোলে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা:

আমেরিকান লাইব্রেরি এসোসিয়েশনের মতে, A library is a collection of resources in a variety of forms that is organized by information professionals or other experts

★provide convenient physical, digital, bibliographic or intellectual access and

★Offer targeted services and programs

★With the mission of educating, informing or entertaining a variety of audiences.

**ইউনিস্কো-এর মতে, ”মুদ্রিত বই, সাময়িকী অথবা অন্য যে কোন চিত্রসমৃদ্ধ বা শ্রবণ-দর্শন সামগ্রীর একটি সংগঠিত সংগ্রহ হল গ্রন্থাগার। যেখানে পাঠকের তথ্য, গবেষণা, শিক্ষা অথবা বিনোদন চাহিদা মেটানোর কাজে সহায়তা করা হয়।”

**J. H. Shera এর মতে, ‘The library is an organization, a system designed to preserve and facilitate the use of graphic records.Ó

**C. C, Aguolu & I. E. Aguolu এর মতে, ”গ্রন্থাগার হচ্ছে মানুষের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেরে নথিপত্রের সমষ্টি যেটি নানা ফরম্যাট ও ভাষায় সংগঠন ও ব্যাখ্যা করা হয়। গ্রন্থাগার মানুষের জ্ঞান, বিনোদন ও নান্দনিক উপভোগের নানা চাহিদা পূরণ করে।”

**সেনগুপ্ত ও চক্রবর্তী-এর মতে, ”গ্রন্থাগার হলো এমন একটি সংগঠন যেখানে বই, পত্র পত্রিকাও সমজাতীয় উপকরণ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করা হয়।”

বর্তমান সময়ে গ্রন্থাগার জ্ঞানের সকল শাখার পুস্তকাদি, সাময়িকী, পাঠ্য সামগ্রী, ই-বুক, ই-জার্নাল ইত্যাদি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ করে।

**গ্রন্থাগারেরপ্রকারভেদ:

গ্রন্থাগার নানা প্রকারের হয়ে থাকে। সাধারনত প্রতিষ্ঠানিকভাবে গ্রন্থাগারকে ৪ ভাগে ভাগ করা যায়।যথা-

১।জাতীয়গ্রন্থাগার

২।গণগ্রন্থাগার

৩।একাডেমিকগ্রন্থাগার

৪। বিশেষ গ্রন্থাগার।

১। জাতীয় গ্রন্থাগার: জাতীয় গ্রন্থাগার সাধারনত দেশের সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। অন্যান্য গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার পেছনে যে সকল কারণ বিদ্যমান, এ ক্ষেত্রেও তার সবগুলো কারণ বিদ্যমান। তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। আর এটি হয় এজন্য যে, জাতীয় পর্যায়ের গ্রন্থাগার অন্য আর দশটি অনুরূপ প্রতিষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এটি একটি নন-লেন্ডিং প্রতিষ্ঠান। মূলত: জাতীয় গ্রন্থাগার এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার সংগ্রহের পরিধি জাতীয় ভিত্তিক, গুরুত্ব আন্তর্জাতিক এবং দেশ ও জাতি সম্পর্কে দেশী-বিদেশী সকল প্রকাশনা সংগ্রহ করে জাতীয় ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করাই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

২। গণগ্রন্থাগার: পাবলিক লাইব্রেরি বা গণগ্রন্থাগার জনগণের বিশ্ববিদ্যালয়। সমাজের সকল স্তরের লোকের চাহিদা পূরণের জন্য এর উৎপত্তি ও বিকাশ। অন্য কোন গ্রন্থাগার এ উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় না। এমনকি এর মত বহুমূখি সেবা দিতেও প্রস্তুত নয়। সমগ্র জাতিকে পরিকল্পিত উপায়ে সাহায্য করা এর লক্ষ্য, বিশেষ করে বুদ্ধির পরিপক্কতা অর্জনে সহায়তা গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে একটি। সমাজে সকল প্রকারের সদস্য ছাত্র, যুবক, বৃদ্ধ, মহিলা ও বিভিন্ন পেশাজীবী যেহেতু এর ব্যবহারকারী সুতরাং আবশ্যিকভাবে সংগ্রহ করা হয়ও বহুমূখী।

৩। একাডেমিক গ্রন্থাগার: একাডেমিক গ্রন্থাগার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পাঠ ও গবেষনা প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব গ্রন্থাগারে কেবল পাঠ্য ও পাঠ্য সহায়ক উপকরণই থাকে না, পাশাপাশি বিভিন্ন রেফারেন্স সামগ্রীসহ বিভিন্ন বিষয়ের তথ্য উপকরণ সংগ্রহীত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে অন্যতম উদ্দেশ্য থাকেগবেষকদের প্রয়োজনীয় পাঠ্য উপকরণ সংগ্রহের মাধ্যমে জ্ঞানচর্চায় অগ্রসর পর্যায়ে সহায়তা জোগানো।

৪। বিশেষ গ্রন্থাগার: বিশেষ গ্রন্থাগার আসলে এক ধরনের গবেষণা গ্রন্থাগার, যাকে আমরা টেকনিক্যাল লাইব্রেরিও বলি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে নানা বিষয়ে গবেষণা কর্মের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। এই গবেষণা কর্মে সহায়তা জোগানোর জন্যই বিশেষ গ্রন্থাগারের আবির্ভাব। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি নানা বিষয়ে তথ্য উপকরণ সংগ্রহের মাধ্যমে বিশেষ গ্রন্থাগারগুলো সমাজে এক ব্যাতিক্রমী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গ্রন্থাগার বিশেষজ্ঞগণের মতে, একটি সভ্য দেশের প্রতি তিন হাজার মানুষের জন্য একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি প্রয়োজন। সে হিসেবে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য প্রয়োজন ৬০ হাজার লাইব্রেরি। যেখানে বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি লাইব্রেরি আছে মাত্র ২,৫০০ এর মত। যা নিত্তান্তই সামান্য পরিমাণ। জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর পাঠ চাহিদা মিঠাতে প্রয়োজন আরো বেশি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ।

টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নেন সাথে সাথে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষং (ঝউএ) এর ১৭ টি অভিষ্টের মধ্যে মধ্যে অধিকাংশ লক্ষ্যমাত্রায় জোর দিয়ে বলা হচ্ছে গুণগত পরিবর্তনের কথা। আর ১৭ টি অভিষ্ঠ অর্জনের পিছনে গুণগত শিক্ষা শব্দটি রাখতে বিশেষ ভূমিকা। অর্থ্যাৎ সকল উন্নয়ন ও পরিবর্তনের পিছনে মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করবে শিক্ষা ও সচেতনতা। যার অন্যতম নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে গ্রামীণ পাবলিক লাইব্রেরি।

আর গ্রন্থাগার উদ্যোক্তাদের কে অবশ্যই লাইব্রেরি সাইন্সের এস.আর রঙ্গনাথন এর পাঁচ আইন অনুসরণ করে গ্রন্থাগারগুলো কে পরিচালনা করতে হবে। ১৯২৪ সালে এস.আর রঙ্গনাথন গ্রন্থাগার সঠিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার জন্য পাঁচটি যুগান্তকারী ধারণা প্রণয়ন করেন। যা লাইব্রেরি সাইন্সে এস.আর রঙ্গনাথনের পাঁচ আইন বলে পরিচিত। ত হচ্ছে: First law: Book are For Use.; Second Law: Every Reader His/Her Book.; Third Law: Every Book Its Reader.; Fourth Law: Save The Time Of The Reader.; Five Law: The Library Is A Growing Organism.নিঃ

নিঃসন্দেহে বলা যায়, মানব সমাজে যে কয়েকটি প্রাচীন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত প্রতিষ্ঠান রয়েছে তারমধ্যে গ্রন্থাগার অন্যতম। তাই গ্রন্থাগার যাঁরা চর্চা করেন তাদেরকে গ্রন্থাগার ব্যবস্থপনা অনুসরণ করতে হয় কিছু সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি। যার মধ্যে রঙ্গনাথনের পাঁচটি পরামর্শ গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের শক্ত ভিত্তি হিসেবে দেখানো হয়।

লেখকঃঃ

মো: ইমাম হোসাইন

ট্রাস্টি বোর্ড চেয়ারম্যান, পাঠাগার আন্দোলন বাংলাদেশ

সভাপতি, বাংলাদেশ বেসরকারি গণগ্রন্থাগার পরিষদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর