আজ ২৯শে শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৩ই আগস্ট ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

মনের লকডাউন

অতিকথন বিরক্তির কারণ। তাই দীর্ঘায়িত না করে সরাসরি চলে যাব গল্পে। কখনো গল্প লিখিনি। লকডাউনের কারণে কোথাও বের হতে পারছি না। অসুস্থ হওয়াতে করোনা টেস্ট দিয়েছি। দ্বিতীয়বারের মতো বাড়িতে আইসোলেশনে আছি। এই কারণে সময়টা খুব বাজে কাটছে। লেখালেখির মধ্য দিয়ে নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা করছি। পৃথিবীব্যাপী চলছে লকডাউন। তার সাথে মিলিয়ে গল্পেরও নাম দিয়েছি “মনের লকডাউন।”

গল্পের মূল চরিত্র হলো মানব আহমেদ। পেশায় একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। মানুষ ও সমাজ নিয়েই তার যত স্বপ্ন,ভাবনা ও কাজ। তাই তার নামের সাথে সমাজকর্মী পরিচয়টা বড়্ড় বেশি মানানসই। কাজকর্মে, চিন্তাভাবনায় গোড়ামী ও উগ্র আধুনিকতা মুক্ত মধ্যমপন্থার একজন হিসেবে মানব নিজেকে সবার কাছে উপস্থাপন করেছেন। নিজ এলাকায় একটি পাবলিক লাইব্রেরী ও জিমনেসিয়াম প্রতিষ্ঠা করেছেন । লাইব্রেরীর লাইব্রেরিয়ান দ্বারা পরিচালনা করেন একটি মোবাইল ব্লাড ব্যাংকও। কারো রক্তের প্রয়োজন হলে ফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট হাসপাতালে রোগীকে রক্ত দিয়ে আসে সহযোদ্ধারা। অপর দুই চরিত্র হলো ঘুড়ি ও খেয়া।

খেয়া মনে মনে ভাবছে-কি ব্যাপার! ঘুড়ি প্রতিদিন ছেলেটির সাথে গাড়িতে করে কোথায় যায়, ওর মতিগতি ভাল লাগছে না আমার।
মানব- এই খেয়া! ঘুড়িকে দেখেছ?
খেয়া- প্রতিদিন ঘুড়ি যে আর একটা ছেলের সাথে ঘুরতে যায় তা লুকিয়ে বলল- না দেখিনি। মুহূর্তেই মানবের চেহারাটা মলিন হয়ে গেল। ফোন দিয়ে দেখুন।
মানব- ফোন কখনো বন্ধ,কখনো বিজি। অনলাইনেও পাচ্ছিনা।

দুই

হিরো ও ঘুড়ি এখন প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ফোনে কথা বলে। ঘুড়ি প্রতিদিন রাত জেগে নতুন আইডি থেকে ওর সাথে চ্যাটে সময় কাটায়। হিরোর সাথে ঘুরা, ডার্ক রেস্টুরেন্টে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করা এখন ঘুড়ির অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
হিরো- চোখ বন্ধ কর।
ঘুড়ি- কেন?
হিরো- সারপ্রাইজ আছে।
ঘুড়ি – আচ্ছা।
হিরো- চোখ খোল।
ঘুড়ি- ওয়াও! এত দামী মোবাইল আমার জন্য! পাগল কোথাকার কেন শুধু শুধু আনতে গেলে!
হিরো- তুমি যে আমার জান!
দিন যতই যাচ্ছে হিরো ও ঘুড়ির সম্পর্কটা ততই অন্যদিকে বাঁক নিতে চলছে, ডার্ক রেস্টুরেন্ট এর সম্পর্কগুলো যেমন হয় ঠিক তেমনই। আজ রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠার সময় সামনাসামনি পড়ে গেল মানব। ঘুড়ি কিছুটা বিব্রত তবুও নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে হিরোকে বলল ও আমার বন্ধু মানব।
মানব যেন আকাশ থেকে পড়লো। পাঁচ বছরের ভালোবাসার মানুষকে পরিচয় করে দিল স্রেফ বন্ধু হিসেবে! উভয় হাত মিলানোর পর ঘুড়ি ও হিরো গাড়িতে উঠে চলে গেল আর বিষাদে ভরে গেল মানবের মন।
রাতে খেয়ার মোবাইলে অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন এলো। ফোন রিসিভ করার পর দেখা গেল ঘুড়ি।
আজকাল ঘুড়ি ভার্সিটির নামকরে ঘর থেকে বের হলেও ভার্সিটিতে না গিয়ে বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ায়।কথোপকথন..
খেয়া- কিরে অপরিচিত নাম্বার কেন?
ঘুড়ি- এমনি
খেয়া- আগের নাম্বার বন্ধ কেন?
ঘুড়ি- কই মাঝেমধ্যে খোলা থাকে তো। আগামীকাল ক্লাসে যাবো । আজকের লেশনসমূহ বল।
লেশন বুঝে নিয়ে ঘুড়ি ফোন রেখে দিল।
পরদিন ক্লাস শেষে ঘুড়ি ও খেয়ার মধ্যে কথা হচ্ছিল:
খেয়া- কিরে তুই আজকাল আমাবস্যার চাঁদ হয়ে গেছিস। তোর দেখা-সাক্ষাত মিলে না। মানব ভাইয়ের সাথে তোর কথা হয় না? তোর খুঁজে ভার্সিটিতে কয়েকবার আসছিল। আমাকে ফোন দিয়েছিল অনেকবার, তোকে নাকি পাচ্ছে না। তোকে দেখলে আমাকে ফোন দিতে বলছে। দাঁড়া মানব ভাইকে একটা ফোন দিই।
ঘুড়ি- না না ফোন দেয়ার দরকার নেই। ভার্সিটির বাইরে হিরো আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
খেয়া-তুই মানব ভাইকে এভাবে ভুলে যেতে পারলি?
ঘুড়ি- তোর সমাজকর্মী মানব ভাইয়ের কাছে কি আছে! ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়। পাঁচ বছরে আমায় কী দিয়েছে! ওই বকুলতলায় আড্ডা দিয়ে শুধু ঝাল মুড়ি আর ফুচকা খাইয়েছে। হিরো আমাকে নিয়মিত ভালো রেস্টুরেন্টে খাওয়ায়, দামী দামী গিফট করে। দেখ কত দামি মোবাইল আমাকে গিফট করেছে! আমি কোন কিছু চাওয়ার আগেই সবকিছু পেয়ে যাই। সে আমার জীবনটা কানায় কানায় পূর্ণ করে দিয়েছে।
খেয়া- ছি: তোকে আমার বান্ধবী ভাবতে কষ্ট হয়! তুই নষ্ট হয়ে গেছিস!
ঘুড়ি- এতই যখন দরদ তাহলে তুই যা ওর কাছে।
খেয়া- উনি যদি একবার চাইতো আমি হাজারবার ধরা দিতাম উনার কাছে‌। উনার মত সঙ্গী পাওয়া তো সৌভাগ্যের ব্যাপার। তুই একদিন আফসোস করবি। হাতের নাগালে পেয়েও তুই হিরে চিনলি না।

তৃতীয়
খেয়া- হ্যালো! মানব ভাই কোথায় আছেন?
মানব- আমি বকুলতলায় আছি।
খেয়া- একটা কথা ছিল
মানব- বল
খেয়া- আচ্ছা আমি ওখানে আসছি আপনি থাকেন।
আধঘন্টার মধ্যে খেয়া বকুল তলায় পৌছে গেল। দেখল বকুলতলায় বিষন্ন মনে মানব একা বসে আছে।
খেয়া- মানব ভাই! এখানে একা একা কি করছেন?
মানব- চমকে উঠলো! কিছু না
খেয়া- ঘুড়ির সাথে কথা হয়েছে?
মানব- গম্ভীর কণ্ঠে, হ্যাঁ হয়েছে
খেয়া- কখন?
মানব- ১৫ দিন আগে। জানো খেয়া, ঘুড়ির জীবনে এখন আর আমাকে প্রয়োজন নেই। ওর জীবনে এসেছে নতুন সঙ্গী। যে মানুষ আমাকে প্রতিদিন একবার না দেখলে ব্যাকুল হত, আমার সাথে ফোনে কথা না বললে যে অস্থির হয়ে উঠতো, রাতে ঘুমানোর আগে অন্তত একবার আমার সাথে ফোনে কথা না বললে যার ঘুম হতো না সে কেমনে এত দ্রুত পরিবর্তন হয়! এই বকুলতলায় আমরা দুজনে কত সময় কাটিয়েছি, কখনো কখনো তুমিও আসতে। থাক সেসব কথা। এখন তোমার কথা বল খেয়া। তুমি কি জন্য এসেছ?
খেয়া- ভাবির আগামী ১০ তারিখ ডেলিভারি। ও নেগেটিভ রক্তের প্রয়োজন হতে পারে।
মানব- চিন্তা করো না। ব্যবস্থা করবো। ঠিক আছে খেয়া তুমি এখন যাও।
খেয়া- আপনিও চলুন
মানব- না। আমি আরো কিছুক্ষণ থাকবো। তুমি যাও।
খেয়া মানবের কষ্টগুলো ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মানবের চাওয়াতে খেয়া সেখান থেকে চলে এলো।

চতুর্থ
দুদিন পর হোটেল পাহাড়িকায় “শ্রেষ্ঠ বাঙালি যুবক” প্রতিযোগিতার বাছাইয়ের প্রথম পর্ব। এই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করছে বাংলা একাডেমি। এই অনুষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্য হলো যুবসমাজের কাছে বাংলার সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা, আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্যকে কিভাবে পুনরুদ্ধার করা যায়, তাদের হৃদয়ে আমাদের শিল্প-সাহিত্যের বীজ বপন করা, ৫২ ও ৭১ এর ছবি যুবসমাজের মনে অঙ্কন করা, সর্বোপরি যুবসমাজকে নৈতিকভাবে শক্তিশালী করে আগামীর যোগ্য রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে গড়ে তোলা। যেসব যুবক শিল্প-সাহিত্য অনুরাগী, যাদের লেখালেখির চর্চা আছে, কবিতাপ্রেমী, সঙ্গীতপ্রেমী, স্বেচ্ছাসেবী ও সৃষ্টিশীল চেতনায় উদ্বুদ্ধ তাদের যে কেউ এই প্রোগ্রামে অংশ নিতে পারবে। একমাস আগ থেকেই এর রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহ থেকে হোটেল পাহাড়িকায় বাংলা একাডেমির অস্হায়ী অফিসে প্রতিযোগীদের প্রবেশ পত্র বিতরণ শুরু হয়েছে। রিসিপশনে প্রবেশ করে মানব অবাক। কারণ অভ্যার্থনা কক্ষে বসা তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে স্মার্ট ছেলেটি তার ভার্সিটি জীবনের বন্ধু। নাম হলো নীলিম। দীর্ঘদিন পর দুই বন্ধু একে অপরকে দেখে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরল। নীলিম মানবের কাছ থেকে হোটেলে আসার কারণ জানতে চাইল। মানবের কাছ থেকে কারণ শোনার পর বাংলা একাডেমির অস্থায়ী অফিস দেখিয়ে দিল এবং বলল তাড়াতাড়ি চলে আয়, দুই বন্ধু একসাথে কফি খাবো। ১৫ মিনিট পর মানব প্রবেশপত্র নিয়ে ফিরে এসে লবিতে দুই বন্ধু বসে কফি পান করছিল। দুতলা থেকে এক যুগলকে নামতে দেখে মানব দ্রুত অন্যদিকে ঘুরে গেল। মেয়েটি একটু দূরে দাড়িয়ে রইল এবং ছেলেটি রিসিপশনে গিয়ে চাবি জমা দিয়ে দুজনে একসাথে বের হয়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে মানব মনে মনে বলল- এসব দেখার আগে আমার মরণ কেন হল না বিধি! ঘুড়ি এখন ভালোবাসা ফেরি করে! নীলিমের কাছে জানতে চাইলো ছেলেটির পরিচয়। নীলিম বলল- বড়লোকের ছেলে। কিছুদিন পরপর গার্লফ্রেন্ড পাল্টায়। ৩/৪মাস যাবত এই মেয়েটির সাথে টাইম পাস করছে। কিছুদিন পর হয়তো অন্য কেউ আসবে। কোন কিছু বুঝতে না দিয়ে কফি শেষ না করেই মানব নীলিমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলো।

পঞ্চম

ঘুড়ির স্মৃতি বুকে নিয়ে বেঁচে আছে মানব। প্রতিদিন ব্যবসায়িক কাজ সেরে বিকেলে স্মৃতিবিজড়িত বকুলতলায় বসে থাকে। এই বকুলতলায় ঘুড়ির সাথে ওর পরিচয়। পরিচয়ের দুই মাস পর এই বকুলতলাতেই তাদের ভালোবাসার যাত্রা শুরু হয়। এইতো সেদিন মাত্র তিন মাস আগে এখানে ঘুড়ি ও মানব পরস্পরের মাথায় হাত রেখে শপথ করেছিল কখনো একে অপরকে ছেড়ে চলে যাবে না, অন্য কাউকে বিয়ে করবে না। মানবের কাছে আজ সেসব কেবল স্মৃতিই। এরমধ্যে খেয়ার ফোন এলো।
মানব- হ্যালো খেয়া বলো
খেয়া- ভাবির জন্য রক্তের কথা বলেছিলাম ভুলে গেছেন?
মানব- না। মনে আছে।
খেয়া- আজ সন্ধ্যা ৭ টায় ও নেগেটিভ এক ব্যাগ রক্ত লাগবে।
মানব- আমি ব্যবস্থা করে রেখেছি চিন্তা করো না। সঠিক সময়ে পৌঁছে যাবে। কোন হাসপাতাল?
খেয়া- আরোগ্য নিকেতন হাসপাতাল
মানব- ডোনার হাসপাতালে যাবে তুমি রিসিভ করো
খেয়া- আচ্ছা। তো কোথায় আছেন, কি করছেন?
মানব- বকুলতলায় আছি।
খেয়া- কেন শুধু শুধু নিজেকে কষ্ট দিচ্ছেন! ও তো অনেক ভালো আছে
মানব- ও ভালো থাকলে আমার চেয়ে কে খুশি বল! ও সবসময় ভালো থাকুক- এটাই আমার কামনা। ঠিক আছে ভালো থেকো।
খেয়ার ইচ্ছে ছিল আরো কিছুক্ষণ কথা বলার কিন্তু মানবের অনিচ্ছাতে তা সম্ভব হয়নি।

পরের দিন দুপুরে খেয়া মিষ্টি নিয়ে মানবে বাসায় হাজির। এর আগেও ঘুড়িসহ দুইবার এসেছিল এই বাড়িতে। এসেই মাকে কদমবুচি করলো। মা ওকে দেখে খুব খুশি। মাকে কোন প্রশ্নের সুযোগ না দিয়ে মিষ্টিমুখ করালো। তারপর কিসের মিষ্টি ব্যাখ্যা করলো।
খেয়া- খালাম্মা মানব ভাই কোথায়?
খালাম্মা- ও রুমে আছে। আমি তোমাকে কিছুদিন যাবৎ মনে মনে খুঁজছিলাম কিন্তু তোমার নাম্বারটা আমার ছিল না। তাই যোগাযোগ করতে পারেনি।ঘুড়িকেও ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। আচ্ছা মা বল তো মানবের সাথে ঘুড়ির কোন সমস্যা হয়েছে? মানব সবসময় এমন মনমরা থাকে কেন? রাত জাগে, আহারও অনিয়মিত- তুমি কী কিছু জানো মা?
খেয়া- অশ্রু নয়নে-খালাম্মা ঘুড়ি মানবকে ঠকিয়েছে।
আর বেশী কিছু বলতে পারছিনা। খেয়া ধীরে ধীরে মানবের রুমে প্রবেশ করল। দেখতে পেল ঘুড়ির সাথে কোন এক সময় তোলা হাস্যোজ্জ্বল ছবি যত্নসহকারে ফ্রেমবন্ধী করে রেখেছে, বিছানায় পড়ে আছে আরো কিছু ছবি। রুমটা কত সুন্দর গোছালো, ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে আছে শ তিনেক বই। খুব সুন্দরভাবে সাজিয়ে রেখেছে বিভিন্ন সময়ে অর্জিত এওয়ার্ডগুলো। এওয়ার্ডগুলো আবার বিভিন্ন কৃতিত্বের সাক্ষী বহন করছে। কোনটি পেয়েছে সেরা সামাজিক সংগঠক হিসেবে, কোনটি সেরা পাঠক হিসেবে, কোনটি সেরা রক্তদাতা হিসেবে, কোনটি সেরা আবৃত্তিকার হিসেবে, কোনটি অর্জন করেছে সেরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে। মানবের এসব কৃতিত্বে অভিভূত খেয়া। খেয়া যখন মানবের এই কৃতিত্ব অবলোকন করছিল মানব তখন ঘুমাচ্ছিলো। চেহারার মধ্যে ক্লান্তির ছাপ। দেখে মনে হয় কত রাত নির্ঘুম কেটেছে। মানুষকে আবেদনময়ী চেহারাটার এ কী বেহালদশা! ঘুম থেকে ডাকবে নাকি চলে যাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না খেয়া। অবশেষে ওর পায়ের শব্দে ঘুম ভাঙ্গালো। মানব খেয়াকে দেখে হতভম্ব।
মানব- খেয়া তুমি!
খেয়া- অপারেশনে ভাবীর একটি কন্যা সন্তান হয়েছে।গতকাল আপনি ও নেগেটিভ রক্ত ব্যবস্থা করে না দিলে সমস্যা হতো। তাই ভাবি বলেছে বাসায় গিয়ে আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতে। মিষ্টি নিয়ে এসেছি। ফ্রেশ হয়ে নিন মিষ্টিমুখ করাব।
মানব- ঠিক আছে তুমি ড্রয়িং রুমে বস আমি আসছি।

ষষ্ঠ

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে মানবের জন্য খেয়ার মনটা ছটফট করছে। মনজুড়ে তার জন্য জন্মালো শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভালোবাসা। মানুষের জীবন এত সুন্দর ও স্বচ্ছ হতে পারে! আমাদের মধ্যে একটা আমিত্ব কাজ করছে। আমরা সবসময় নিজেকে নিয়ে ভাবছি অথচ মানব কি সুন্দর করে মানুষ নিয়ে ভাবছে, পরম মমতায় মানুষের জন্য কাজ করছে। নিজের ক্ষুদ্র পরিসরের ব্যবসার আয়ের টাকা দিয়ে লাইব্রেরী, জিম ও মোবাইল ব্লাড ব্যাংকের মতো জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে। এ তো মানবতার এক জীবন্ত গবেষণাগার যার সংস্পর্শ পেলে যে কোন খারাপ মানুষেরও মানুষ সম্পর্কে, জীবন সম্পর্কে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। ঘুড়ি কি হারিয়েছে সেটা এখন না বুঝলেও পরে ঠিকই বুঝবে। এমন ছেলেকে ঠকাতে ঘুড়ির বিবেক একটুও বাঁধলো না! এমন জীবনসঙ্গী পাওয়া তো সৌভাগ্যের ব্যাপার! শুয়ে মানবের কথা ভাবতে ভাবতে রাত এগারোটা বেজে গেল। খালাম্মাকে একটা ফোন দিয়ে দেখি মানব বাসায় ফিরেছে কিনা।
ফোন দিয়ে বাসায় ফিরছে নিশ্চিত হলেও না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ছে শুনে ব্যতিত হলো খেয়া। দুশ্চিন্তা, নিদ্রাহীনতা ও অনিয়মিত আহারের কারণে ওর স্বাস্থ্য অনেক খারাপ হয়ে গেছে। আজ খেয়ার বড্ড ইচ্ছে করছে ওর দায়িত্ব নিতে। মানব কী থাকে সেই সুযোগ দেবে, ভেবে কূলকিনারা পাই না খেয়া।

সপ্তম

ঘুড়ির বন্ধুর তালিকা এখন অনেক দীর্ঘ। শুধু ক্লাসের নয় সিনিয়র ক্লাসের অনেক ছেলেও এখন তার বন্ধু। তাদের নিয়ে রেস্টুরেন্ট, ফাস্টফুডের দোকান, শপিং মল, নদীর ধারে, পার্কে, পাহাড়ে আরো বিভিন্ন জায়গায় এখন তাকে প্রায় ঘুরতে দেখা যায়। দুদিন পর সেরা বাঙালি যুবক প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় পর্ব। মানবের ভালো জামা নেই। প্রথম দিন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে মানব বুঝে নিল পোশাকও একটা ফ্যাক্টর। তাই আজ শপিং মলে গেল পাঞ্জাবি-পাজামা কিনতে। দূর থেকে মানব খেয়াল করলো ঘুড়ি মার্কেটের এক পাশে নির্জনে কারো অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। মানব নিজ থেকে ওর কাছে গিয়ে কথা বলল। মানবকে দেখে ঘুড়ির মুখের মধ্যে একটা বিরক্তিভাব। মানব ভাবছে ঘুড়িকে সাবধান করে দেওয়া দরকার। তার নতুন বয়ফ্রেন্ড ভালো নয়। সেদিন হোটেল পাহাড়িকার ম্যানেজার ওর বন্ধু নীলিম, হিরো সম্পর্কে যে রিপোর্ট দিয়েছে তার সত্যতা মিলেছে বিভিন্ন সময় ওকে মেয়ে নিয়ে ঘুরতে দেখে। গতকালও হিরোকে মেয়ে নিয়ে ঘুরতে গেছে মানব। তাই ঘুড়ির মুখে বিরক্তি দেখেও মানব বলল- যে সবার বন্ধু হয় সে কারো নয়। সাবধানে থেকো। ঘুড়ি তুমি আকাশে উড়ছো। যদি উড়তে উড়তে কখনো ক্লান্ত হয়ে পড়ো, যদি কখনো সুতার টান পড়ে তবে ফিরে এসো। আমি তোমার অপেক্ষায় রইলাম। ভালো থেকো।
মানব চলে যাওয়ার পর পর তিনটে যুবক আসলো। ঘুড়ি তাদের সাথে গাড়িতে উঠে চলে গেলো।

অষ্টম

খেয়া, মানবের সাথে শক্ত বাঁধনে বন্দী হতে চায়। এজন্য প্রতিদিন সকাল ও রাতে দুবেলা মায়ের সাথে ফোনে কথা বলে মানবের খোঁজখবর রাখে। মানব এখনো আগের মতো অবসর সময়টুকু বকুলতলায় গিয়ে বসে। ইতিমধ্যে খেয়াও জেনে গেছে মানব অবসর সময় বকুলতলায় থাকে। তাই সেও নিয়মিত বকুল তলায় যায় মানবের সাথে আড্ডা দেওয়ার জন্য যাতে ওর সঙ্গ পেয়ে মানবের মনের দুঃখ দূর হয়। এভাবে দুই মাস হতে চললো। এরই মধ্যে খেয়া দুদিন বকুলতলায় না গিয়ে মানবের মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করলো। আবিষ্কার করতে চাইলো মানবের মনে তার জন্য কোন জায়গা সৃষ্টি হয়েছে কিনা। এই দুদিন মানবের পক্ষ থেকে যখন ফোন বা কোন খোঁজখবর নেওয়া হলো না তখন ও যা বুঝার বুঝে নিল। খেয়া মানবের মরা মনটাকে ভালোবাসা দিয়ে জীবিত করতে চায়। সেই চেষ্টা বিরতিহীনভাবে চালিয়ে যাচ্ছে সে। আজ খেয়া অনেক আশা নিয়ে বকুলতলায় এসেছে। আজ মানবকে তার মনের কথাগুলো বলবে। খেয়া যখন বকুলতলায় পৌঁছল তখন মানব ভাবনায় বিভোর।
খেয়া- কেমন আছেন?
মানব- আলহামদুলিল্লাহ বেশ ভালো আছি।
খেয়া- মিথ্যে কথা। ভালো থাকলে প্রতিদিন একা একা এখানে কি করেন?
মানব- তুমিতো জানো খেয়া এই বকুলতলার সাথে আমার অনেক মধুর স্মৃতি জড়িত। এই সুখের স্মৃতির সন্ধানে আমি প্রতিদিন এখানে আসি। যতদিন বাঁচবো এই স্মৃতি বুকে নিয়েই আমি বাঁচতে চাই।
খেয়া- এটাকে বাঁচা বলে না মৃত্যুর দিকে যাওয়া বলে। পরম মমতায় মানবের হাত দুটি ধরে- তোমাকে বাঁচতে হবে মানব। তুমি এ শহরের শত শত যুবকের আশার আলো, তুমি তাদেরকে বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগাও। তোমার লাইব্রেরীতে গিয়ে প্রতিদিন অনেক পাঠক বই পড়ে আলোর পথে ধাবিত হয়। তোমার জিমে প্রতিদিন অনেক যুবক ব্যায়াম করে নিজের শরীর মনকে শাণিত করে গন্তব্যের পানে ছুটছে। তোমার মোবাইল ব্লাড ব্যাংক কত মানুষের জীবন বাঁচিয়ে দিচ্ছে। তুমি মরে গেলে কে এই প্রতিষ্ঠানগুলো চালাবে? ইতিমধ্যে তুমি “সেরা বাঙালি যুবক”প্রতিযোগিতা দ্বিতীয় ধাপ অতিক্রম করেছো আর তিনধাপ অতিক্রম করে তোমাকে বিজয়ের মুকুট অর্জন করতে হবে। তুমি আমার দুই নয়নের আলো। তোমার যদি চুল পরিমানও কিছু হয় আমার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে মানব। কথা দিচ্ছি আমি তোমাকে ঘুড়ির মতো দুঃখ দেব না, তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। এমনকি মৃত্যুও আমাকে তোমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। যদি আমাকে মরতে হয় তোমার সাথেই মরবো— মানবের মনের আকাশে জমে থাকা কাল মেঘ দূর করতে ভালবাসার কাঙ্গাল খেয়া অশ্রু ভেজা নয়নে কথাগুলো বললো।
মানব- এভাবে বলোনা খেয়া। তুমি আমার জন্য অনেক করে যাচ্ছো, তোমার এই ঋণ শোধ করার ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু তোমাকে দেওয়ার মতোও কোন কিছু আমার নেই। আমার শুধু ওই একটাই মনই আছে যেটা আমি অনেক আগেই ঘুড়িকে দিয়েছি। সেই মনটা ঘুড়ি লকডাউন করে চাবি নিয়ে চলে গেছে। এখন সেই মনটা আমি কাউকে দিতে পারব না– কান্নাভেজা কন্ঠে কথাগুলো বলল মানব।

নবম

খেয়া শুধু পরদুঃখকাতর ও ভালোবাসার কাঙাল এর নাম নয় একটি অদম্য মেয়ের নামও। সে মানবকে জয় করতে না পারলেও হাল ছাড়েনি। এখন সে মানবের মাকে মা বলেই ডাকে। সপ্তাহে অন্তত তিনবার মাকে গিয়ে দেখে আসে। মাকে রান্নাবান্নার কাজে সাহায্য করে, কাপড়চোপড় ধুয়ে দেয় ইত্যাদ। যেদিন সে ওই বাড়িতে যায় ওইদিন সে মাকে কোন কাজ করতে দেয় না। অদম্য ও বুদ্ধিমতী খেয়া সাগরের সাক্ষাৎ না পেলেও মহাসাগরের সাক্ষাৎ পেয়েছে। সে মানবের মন জয় করতে না পারলেও মায়ের মন তো জয় করেছে। সে জানে মানব মাকে খুব ভালোবাসে। যেহেতু এখন মানবের পছন্দের কেউ নেই তাই মায়ের কথাই শেষ কথা। খেয়ার বিষয়টা মা বুঝতে পেরেছে। মাও খুব খুশি এতে। খেয়ার মত একটা দায়িত্বশীল মেয়ের হাতে মানবের দায়িত্ব দিতে পারলে নিশ্চিন্তে থাকবে মাও। আজ ছিল মানবের সেরা বাঙালি প্রতিযোগিতার চতুর্থ ধাপ। মানব ফিরতে ফিরতে চারটা বাজবে। খেয়া মানবের পছন্দের খাবারগুলো রান্না করে রেখেছে। এখন অপেক্ষায় আছে মানবের। খেয়ার বিশ্বাস আজও মানবের মুখে বিজয়ের হাসি ফুটবে এবং তাই হলো। মানব দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল এবং বলল- মা আমি চূড়ান্ত পর্যায়ের জন্য উন্নীত হলাম।

দশম

আজ “শ্রেষ্ঠ বাঙালি যুবক” প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হবে চীন বাংলাদেশ মৈত্রী হলে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী। এতে সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক। উপস্থিত থাকবেন দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীবৃন্দ। ১০০০ জন প্রতিযোগী থেকে ধাপে ধাপে বাছাই করে আজ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে ১০ জন। এই ১০ জনের মধ্য থেকেই প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান নির্ধারণ করা হবে। অতিথিদের বক্তব্যের পালা শেষ। এখন বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। আজ প্রতিযোগীদের পরিবারের সদস্যরাও এসেছে অনুষ্ঠানে। মানবের সাথে এসেছে মা ও খেয়া। মাসব্যাপী চলমান প্রতিযোগিতায় বিজ্ঞ বিচারকমন্ডলী পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচারবিশ্লেষণ করে প্রথম,দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান নির্ধারণ করেছেন। ধীরে ধীরে মঞ্চে উঠে এলেন অনুষ্ঠানের সঞ্চালক। কে হচ্ছেন সৌভাগ্যবান সেই তিনজন এই নিয়ে সবার মধ্যে একটা টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রথমে ঘোষণা দিলেন তৃতীয় স্থান অধিকারী নাম। তারপর ঘোষণা দিলেন দ্বিতীয় স্থান অধিকারীর নাম। মুহুর্মুহু করতালিতে সিক্ত হলো দুজন। সব শেষে প্রথম স্থান অধিকারী নাম। প্রথম স্থান অর্জন করে সেরা বাঙালি হলেন মানব আহমেদ।
সঙ্গে সঙ্গে পুরো হাউজ জুড়ে বয়ে গেল করতালির বন্যা।ধীরে ধীরে পুষ্পিত হতে হতে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সাথে করমর্দনের পর মাথায় পরিয়ে দিল সেরা বাঙালির মুকুট এবং তুলে দিল মানবের হাতে ৫ লক্ষ টাকার চেক। তখনো হাউজ জুড়ে চলছে জয়ের ধ্বনি। সঞ্ছালক অতিথি এবং দর্শকদের পক্ষ থেকে ২ মিনিটের মধ্যে মানবকে কোন পারফরম্যান্স করার অনুরোধ জানানোর প্রেক্ষিতে মানব তার খুব প্রিয় “ঘুড়ি” কবিতা যেটি ঘুড়িরপাশে বসে দু’বছর আগে বকুলতলায় লিখেছিল সেটি কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনালো। ধীরে ধীরে মানব মঞ্চ থেকে নেমে নিজের আসন গ্রহণ করার অল্পক্ষণ পর অনুষ্ঠানের সভাপতি সংক্ষিপ্ত পরিসরে বক্তব্য রেখে অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

“সেরা বাঙালি যুবক” অনুষ্ঠানটির আজকের চূড়ান্ত পর্ব বিটিভিসহ দেশের সকল বেসরকারি চ্যানেল সম্প্রচার করেছে। আজ দেশের সকল প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সোশ্যাল মিডিয়ায় স্থান অর্জন করেছে মানব। দেশ বিদেশের কোটি দর্শক সেরা বাঙালি মানবকে দেখেছে, চিনেছে। ঘুড়িও আজ টিভিতে পুরো অনুষ্ঠানটি দেখেছে।

একাদশ

আজ সকাল দশটায় খেয়া মানবদের বাসায় এলো। যথারীতি মাকে সাংসারিক কাজে সাহায্য করার পর রান্না-বান্না শেষ করে তিনজন একসাথে খেতে বসলো। মা চায় মানব ও খেয়ার বিয়েটা দ্রুত সারতে। এজন্য তিনি খেয়ার অভিভাবক বড় ও ভাই ভাবির সাথে কথা বলেছেন। যদিওবা বিয়ের ব্যাপারে মানবের কোন আগ্রহ নাই তথাপি ওদের বিয়ে দিয়ে মা একটু নির্ভার হতে চায়। হঠাৎ মায়ের ফোন বেজে উঠলো। রিসিভ করে কথা বলা শুরুর পর ধীরে ধীরে মায়ের চেহারার হাস্যজ্জোল ভাবটা মলিন হতে লাগলো। কয়েক মিনিট পর ফোন রেখে দিলো।
মানব- কি হলো মা?
মা- তোর ছোট মামা ফোন করেছে। তোর নানি মা খুব অসুস্থ। এক সপ্তাহ যাবত মেডিকেলে আছে। অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। আমাকে একবার দেখতে চায়। মানব দ্রুত আমার জন্য বাসে বা ট্রেনে একটা টিকিটের ব্যবস্থা কর।
মানব- মা তুমি একা যেতে পারবে না। আমিও সঙ্গে যাবো।
মা- তুই অনেকদিন যাবত ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি অমনোযোগী। ব্যবসা না থাকলে ঘর চলবে কি করে! সামনে তোর বিয়ের খরচ আছে। তুই চিন্তা করিস না বাবা আমি একা যেতে পারবো।
মানব রাত দশটার বাসে যশোরের একটা টিকিটের ব্যবস্থা করলো।
মা যাওয়ার সময় বাসার একটা চাবি খেয়াকে দিল। আগে থেকেই মানবের কাছে একটা চাবি আছে।
মা- শোন বাবা একদিন পরপর খেয়া এসে তরকারি রান্না করে দিয়ে যাবে। তুই ভাত রান্না করে খেয়ে নিস। নিজের প্রতি যত্ন নিস।
মানব- ঠিক আছে মা তুমি কোন চিন্তা করো না।
তুমি পৌছে ফোন দিও।

দ্বাদশ

সময় সবসময় কারো জীবনে ভালো যায় না- এটাই প্রকৃতির নিয়ম। আমরা কেউ প্রকৃতির শাসনের বাইরে নই। কেউ সৃষ্টির প্রতি অবিচার করলে প্রকৃতিও একইভাবে তার উপর চরম প্রতিশোধ নেয়। ঘুড়ির জীবনেও তাই হতে চললো। ঘুড়ি ও হিরো ভালোবাসার এক্সপায়ারড ডেট ছিল মাত্র ৬ মাস। এখন ঘুড়ি হিরোকে ফোন করলে কখনো ফোন বন্ধ, কখনো ফোন বিজি থাকে। অনলাইনেও পাওয়া যায় না। পাওয়া যাবেই বা কেমনে ওর আছে একাধিক নাম্বার ও ফেসবুক আইডি। মানবের সাথে ঘুড়ি যেমন করেছিল তেমনটি হতে চলল আজ ঘুড়ির জীবনে। গত দুই মাস যাবত হিরো ঘুড়িকে পাত্তাই দিচ্ছে না। তার জীবনে আরো যারা বন্ধু আছে তারাও হিরোর মতো তার দেহটাকে ভালোবাসতে চায়। ঘুড়ি গত দুই মাস যাবত ভার্সিটির ক্লাস শেষ করে সোজা বাসায় চলে যায়। বাসা থেকে বিনা প্রয়োজনে বের হয় না। এই দুমাসে তার মধ্যে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অনুশোচনার অনলে সে পুড়ছে। হিরো সাথে ওর সম্পর্কের ৬ মাস কালে বিসর্জন ছাড়া অর্জন বলতে কিছুই নেই। আজ বড্ড মানবের কথা মনে পড়ছে ওর। কিন্তু মানবের কাছে কোন মুখ নিয়ে ফিরে যাবে সে, এই কালি মুখ কেমনে দেখাবে সে! উগ্র আধুনিকতা তাকে একঝাঁক বন্ধু দিয়েছিল ঠিকই কিন্তু কেউ যে তার সত্যিকারের বন্ধু নয় তা সে বুঝতে পেরেছে। মানবের কথাই সত্যি হলো- যে সবার বন্ধু হয় সে কারো নয়। কিছুদিন যাবৎ নিদ্রাহীন রাত কাটছে ঘুড়ির। ঘুমের ওষুধেও কাজ হয়না। অনুশোচনার অনলে পুড়ে চোখের নিচে কাজল জমেছে। মানবকে সে অবহেলা করেছে, কষ্ট দিয়েছে অথচ মানব তাকে এখনো যত্নকরে মনে রেখেছে। “সেরা বাঙালি যুবক” প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার পর মানব, দুই বছর আগে ওকে নিয়ে লেখা কবিতাটি আবৃত্তি করলো। অথচ ঘুড়ি মানবের সেই লালিত ভালবাসাকে কবর দিলো। ঘুড়ি আজ নিজের অপরাধ ও পাপবোধের জন্য নিজেকে ঘৃণা করছে, ক্ষমা করতে পারছে না নিজেকে।

শেষ

গত বছরের ডিসেম্বর মাসে চীনের ওহান প্রদেশে এক আজব রোগ দেখা দিয়েছে যার নাম কোভিড়-১৯। রোগটি অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে ২০০ এর বেশি দেশে। মার্চ মাসে রোগটি দেখা দিয়েছে বাংলাদেশেও। পরিস্থিতি যখন দিন দিন সংকটের দিকে মোড় নিচ্ছিল তখন সরকার দেশ লকডাউন ঘোষণা করে। মার্চ পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে আক্রান্তের সংখ্যা ১২ লাখেরও বেশি মানুষ এবং নিহতের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। এর কোন প্রতিষেধক চিকিৎসা বিজ্ঞান আবিষ্কার করতে পারেনি। তাই জোড়াতালি দিয়ে চলছে চিকিৎসা। আক্রান্ত ব্যক্তি বা লাশ হাসপাতাল বা পরিবার কেউ গ্রহণ করছে না। রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি ও লাশ দাফনের জন্য অনেক ক্ষেত্রে পুলিশকেই দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করেছেন অনেক ডাক্তার, নার্স ,পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা।

মার্চ মাসে বাংলাদেশে করোনার আদি পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করেই এই ছোট গল্পটি রচিত।

একদা মাঝরাতে মানবের ঘুম ভেঙ্গে গেল। জেগে উঠে শরীরে হাল্কা শীত অনুভব করাতে মানব ফ্যান বন্ধ করে গায়ে একটা পাতলা কাঁথা জড়িয়ে আবারো ঘুমিয়ে পড়ল। সেই ঘুম ভাঙলো সকাল দশটায়। এরিমধ্যে জ্বর আরো বেড়ে গেল। থার্মোমিটার বের করে জ্বর মেপে দেখলো ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট। হাত মুখ ধুয়ে হাল্কা নাস্তা করে একটা প্যারাসিটামল খেয়ে আবার শুয়ে পড়ল। সেই ঘুম ভালো ভাঙলো বিকেল চারটায়। তার সাথে নতুন করে যোগ হলো সর্দিও। দ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে ডাক্তারের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। কিন্তু আশেপাশের হাসপাতাল ও রোগ নির্ণয় কেন্দ্রগুলোতে কোন ডাক্তার পাওয়া গেল না। মহামারী করোনা ভাইরাসের ভয়ে সরকারী ডাক্তাররা এখন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও মেডিকেলে যাচ্ছে না। এমনকি প্রাইভেটেও রোগী দেখছে না। এ ব্যাপারে সরকারও হার্ডলাইনে গেছে। বহু কষ্টের বিনিময়ে ফোনে যোগাযোগ করে নিজেকে সেরা বাঙালি যুবক পরিচয় দিয়ে সাহিত্য অনুরাগী এক তরুণ ডাক্তারের সাক্ষাৎ অবশেষে পেল। ডাক্তার রোগী মানবকে আন্তরিকভাবে দেখে জ্বর সর্দির স্বাভাবিক ওষুধ দিল এবং বলে দিলো- যেহেতু দেশের পরিস্থিতি ভালো নয় তাই বাসা থেকে বের হবেন না। মানব নিশ্চিন্তে বাসায় ফিরে রাতের হালকা খাবারের পর ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।

একদিন পরপর খেয়া মানবদের বাসায় এসে রান্না করে দিয়ে যায়। আজকে সে আসবে। মা নানু বাড়ি যাওয়ার পর থেকে খেয়া প্রতিদিন কয়েকবার ফোন করে মানবের খোঁজখবর নেয়। ওদের বাসা থেকে মানবদের বাসায় আসতে রিক্সাযোগে এক ঘন্টা সময় লাগে। এত কষ্ট করে মেয়েটা আসে শুধু মানবের জন্য। মা চলে যাওয়ার পর থেকে খেয়া ওদের বাসা থেকে মানবদের বাসায় রওনা দেওয়ার পূর্বে মানবকে ফোন করে জানিয়ে দেয় তার আগাম বার্তা। আজকেও ফোন করলো এবং জিজ্ঞেস করল সে কোথায় আছে? জ্বরে মানবের যে গা পুড়ে বিছানায় ছটফট করছে তা লুকিয়ে হিপোক্রেসির আশ্রয় নিয়ে স্বাভাবিক হয়ে বলল- বাইরে আছে। খেয়া আসতে আসতে এক ঘন্টা লাগবে তার আগেই মানব বাসা থেকে বেরিয়ে পড়বে। তার কারণ হলো- ওকে অসুস্থ দেখলেই খেয়া অস্থির হয়ে উঠবে, এমনিতেই তার কাছে ওর পরিবার অনেক ঋণী হয়ে গেছে।
মানব বাসা থেকে বের হয়ে যাবার ২০ মিনিট পর খেয়া বাসায় পৌঁছল। এসেই বাসা পরিষ্কার করে মানবের জন্য রান্না করে চলে গেল। লকডাউনের কারণে ওর ভার্সিটি বন্ধ হওয়াতে সে চাইলে আরো কিছুক্ষণ থাকতে পারতো। কিন্তু মা না থাকাতে চলে গেল।
মানব দুইটার দিকে বাসায় ফিরে একমুঠো খেয়ে ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম থেকে উঠে খেয়াল করল জ্বরের সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে কাশিও। প্রচন্ড রকম কাশি। পুরো শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে কাশি। এত প্রচন্ডতার মধ্যেও সে ওষুধ খেতে ভুল করেনি। রাতে ওষুধ খাওয়ার পরও জ্বর, কাশি কমেনি। ঘুমাতে পারেনি সারারাত। নির্ঘুম থাকাতে শরীর একদম দুর্বল হয়ে গেছে। পরদিন সকালে গলা ব্যথার কারণে কথা বলতেই পারছে না। আজকে খেয়া আসবে না। তাই ফোন দিয়ে মানবের খোঁজ খবর নিচ্ছে। খেয়া ফোন দেওয়ার সাথে সাথে মানব কেটে দিয়ে ক্ষুধে বার্তা পাঠালো বিজি। তাই ও আর ফোন দিল না। রাতে তিনবার ফোন দেওয়ার পরও ফোন রিসিভ করেনি। পরদিন নিয়ম অনুযায়ী খেয়া বাসায় আসবে। কিন্তু করোনা প্রতিরোধের জন্য পুলিশের কঠোরতার কারণে রাস্তায় কোন যানবাহন চলছে না। তাই বাসা থেকে বের হয়ে এক ঘন্টা চেষ্টা করেও কোন যানবাহন না পেয়ে খেয়া বাসায় ফিরে গেল। বাসায় ফিরে গেলেও এক অজানা আশঙ্কায় ওর মনটা অস্থির হয়ে উঠছে। কোন কিছু হয়ে গেল কিনা মানবের! ফোন দিলে নাম্বার বিজি দেখায়। সে রাত বারোটা পর্যন্ত অন্তত ৫০ বার ফোন দিয়েছে। পরদিন সকাল ছয়টায় সে বাসা থেকে বের হয়ে মানবের বাসায় গেল। বাসায় গিয়ে দেখল মানবের দেহটা এই কয়েকদিনে প্রায় কঙ্কাল হয়ে গেছে। বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। স্পষ্ট কথা বলতে পারছে না, ভেঙ্গে ভেঙ্গে কথা বলছে। বেলুনে হাওয়া দেওয়ার সময় যেমন ফুলে ওঠে তেমনি শ্বাস নেওয়ার সময় ওর বুকটা ফুলে উঠছে। এসব দেখে যখন খেয়া ওর দিকে দৌড়ে যাচ্ছিল তখন মানব ওকে থামিয়ে দিয়ে অস্পষ্ট ভাষায় বলল- সে কোভিড়-১৯ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে যেটা অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। টেস্ট সহজলভ্য না হওয়ার কারণে সে টেস্ট করাতে না পারলেও তারমধ্যে করোনার সব লক্ষণসমূহ দেখে মানব শতভাগ নিশ্চিত হয়েছে সে করোনা আক্রান্ত। মানবের কোন কথাই ঘুড়িকে বিরত রাখতে পারেনি। সে দৌড়ে গিয়ে পরম মমতায় মানবকে ঝাপটে ধরে বললো- তোমার কিচ্ছু হয়নি,তোমাকে এক্ষুনি আমি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো। খেয়া একা মানবকে তুলতে পারছিল না। অনেক ডাকাডাকির পর পাশের বাসার দরজা খুললেও কেউ এগিয়ে এলো না করোনার ভয়ে বরং পুনরায় দরজা বন্ধ করে রাখলো। খেয়া মানবকে কোনরকম কোলে নিয়ে বাসা থেকে বের করলো। অনেকের কাছে সাহায্য চাইলো কিন্তু কেউ কাছে এলো না। রাস্তাঘাট পুরো ফাঁকা। কোথাও কোন গাড়ি দেখা যাচ্ছে না। সে মানবকে কোলে নিয়ে কিছুক্ষণ দৌড়ায় কিছুক্ষণ হাফায়। এভাবে সে কিছুদূর এগিয়ে গেল। অনেকেই তার এ দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে ফেসবুকে আপলোড দিচ্ছে। অবশেষে একটা রিকশা পেল। মেডিকেলে পৌঁছে অনেক ধরনা দেওয়ার পরও জরুরী বিভাগ তাকে রিসিভ করছে না। অবশেষে খেয়া বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকে ফোন দিল। পরিচালক মহোদয় সেরা বাঙালি যুবকের এই অবস্থা শুনে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে দিলেন ফোন। অবশেষে কর্তৃপক্ষ উপরের চাপে মানবকে ভর্তি করালো। ডাক্তার এসে দেখে ওষুধ দিয়ে গেল, অক্সিজেন দিলো। কিন্তু ওর শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিক। ইতিমধ্যে করুনা টেস্টের জন্য নমুনা সংগ্রহ করেছে কতৃপক্ষ। ওর অবস্থা মুহূর্তে মুহূর্তে জটিল হচ্ছে। শেষ মুহূর্তে এসে অস্পষ্ট কন্ঠে ধীরে ধীরে মানব যা বলল-

মানব- খেয়া আমার সময় ফুরিয়ে আসছে। তুমি আমার জন্য এত কিছু করার পরও তোমাকে আমার মনটা দিতে পারিনি বলে ক্ষমা করো। আমার মনটা অনেক আগেই ঘুড়িকে দিয়েছি। সে আমার মনটা লকডাউন করে চলে গেছে।
খেয়া- মানব আমি তোমার ওই অবরুদ্ধ মনকে উদ্ধারের জন্য আমি সারা জীবন তপস্যা করবো। প্রয়োজনে সারা পৃথিবীতে আমি কারফিউ জারি করবো। তবুও তোমাকে চলে যেতে দেব না। গেলে আমরা দুজন একসাথে যাব।
কিন্তু যার উপর সৃষ্টিকর্তার ডাক পড়ে তাকে আটকানোর সাধ্য কার! এরিমধ্যে মানবের ফোন বেজে উঠলো। দেখা গেল ঘুড়ির আগের নাম্বার থেকে ফোন এসেছে। মানব তো কথা বলতে পারছে না। তাই খেয়াকে ইশারা করে বললো ফোন রিসিভ করতে। রিসিভ করে লাউড দিল-
ঘুড়ি- কান্না ভেজা কন্ঠে অপরাধবোধ থেকে বলছে, তুমি একদিন বলেছিলে- “ঘুড়ি যদি তুমি আকাশে উড়তে উড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়ো, যদি কখনো সুতোর টান পড়ে তবে চলে এসো।” সেই দিন আমার জীবনে এসেছে মানব। আজ আমি ক্লান্ত, আজ আমার সুতোর টান পড়েছে। মানব আমি আবার তোমার কাছে ফিরে আসতে চাই ।
তখন মানবের চোখ দিয়ে শুধু অজস্র পানি গড়াচ্ছিল। কিছুই বলতে পারেনি সে। ঘুড়ি বলল- কি হলো মানব কথা বল! আমি তোমাকে চিনিনি, তুমি মানব নও, তুমি মহামানব। তুমি আমাকে ক্ষমা করো। তখন মানবের শ্বাস-প্রশ্বাসের টানটা অনেক বেড়ে গেলো। খেয়া মোবাইল নিয়ে বলল- মানব খুবই অসুস্থ। হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। পারলে চলে এসো। ঘুড়ি হাসপাতলে গিয়ে দেখল- বিছানায় বসে খেয়া মানবের লাশ বুকে জড়িয়ে বিলাপ করছে।

মানবের মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর খেয়ার শরীরে জ্বর উঠল। পরের দিন সর্দি। এরপর কাশি এবং গলা ব্যথা। খেয়া বুঝে নিল সে এক নতুন জীবনকে বরণ করতে যাচ্ছে, মহান সৃষ্টিকর্তা তাদের দুজনকে একত্রিত করতে যাচ্ছে। জীবন্ত মানবের মনে যে লকডাউন ছিল মহান সৃষ্টিকর্তা খেয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেই লকডাউন তুলে নিয়েছে। আজ তারা দুজন এক পৃথিবীর বাসিন্দা।

মহিউদ্দীন মহৎ খোকন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর